শর্টকাট আয়ের ৬টি বিপদ, যা আপনার ক্যারিয়ারের জন্য হুমকি স্বরূপ - সজীব রহমান - ব্লগ

শর্টকাট আয়ের ৬টি বিপদ, যা আপনার ক্যারিয়ারের জন্য হুমকি স্বরূপ

ইদানিং নবীনদের মধ্যে একটা প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তা হলো “শর্টকাট” বা অল্প কাজে বেশি আয়। বিভিন্ন কারণে এসব তারা করে থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কিছু ব্যাক্তির অনুপ্রেরণা। আসলে অনুপ্রেরণা বললে ভুল হবে। কারণ যারা শেখাচ্ছেন, তাঁরা কিন্তু অনেক কষ্ট করে, রাত দিন রিসার্চ করেই এমন কিছু কলাকৌশল রপ্ত করেছেন। আর সেই কষ্টার্জিত কলাকৌশল যখন তাঁরা সবার সামনে উপস্থাপন করতে যাচ্ছন তখনই নতুনরা সেটা নিচ্ছেন “শর্টকাট” হিসাবে। আর এখানেই হচ্ছে জীবনের আরেকটি ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া।

shortcut-never-works

আমি নিজের উপলব্ধি থেকে এটা বলতে পারি যে, যদি কোন এক্সপার্ট ব্যক্তি আপনার সাথে সারা দিন সময় দিয়ে আপনাকে সামনে রেখে তার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতিটিও আপনাকে মুখস্ত করিয়ে ফেলেন তবুও সেই মুহূর্তে আপনি উনার মত কখনই হতে পারবেন না। হয়তো তার কিছু “আছর” আপনার উপর পড়বে সাময়িক সময়ের জন্য।  কারণ উনি অনেক চড়াই উতরাই পার করে শিখেছেন, আর আপনি কোন মেধা না খাটিয়েই শুধু মাত্র একটা অংশ জেনেছেন। হয়তো ঠিক মত উপলব্ধিটি পর্যন্ত আপনি করতে পারেননি। হয়তো ভেবে ফেলছেন যে এইতো পেয়েছি আয়ের উৎস। এবার আর ঠেকায় কে।

কিন্তু দিন শেষে বাস্তবতা হচ্ছে, আপনি একদিন আয় করলেন, ১ মাস আয় করলেন হয়তো ১ বছরও সেই পদ্ধতিতে আয় করলেন। তবে এটা আমি হলফ করে বলতে পারি যে সেই শর্টকাট কখনই চিরস্থায়ী হবে না। হ্যাঁ, হয়তো ভাবছেন আরে ভাই ১ মাস ধুমিয়ে আয় করবো এরপর না হয় আবার যে শর্টকাট আসবে সেটাতে ঝাপিয়ে পড়বো।  আসলে এমনটিই বেশিরভাগ সময় সবার করে থাকে। তাদের কাছে ব্যপারটা তেমন গুরুত্বর নয়। কিন্ত দুঃখজনক এবং ভয়ঙ্কর ব্যপার হচ্ছে এই “শর্টকাট” আপনাকে ধীরে ধীরে একজন অকর্মন্ন ব্যক্তি হিসাবে গড়ে তুলছে। এবং আরো দুঃখজনক হচ্ছে এই ব্যপারটা উপলব্ধি করতে আপনার সময় লেগে যেতে পারে ১ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত !!!

আসলে কি হয়? শর্টকাট দিয়ে আয় করবো, এতে আমার ক্ষতি হবে কেন? আমিতো ভালোই আছি, একদম মাস্ত আছি। আপনি ঠিকই বলেছেন সাময়িক ভাবে আপনি মাস্ত আছেন। কিন্তু এই অভ্যাস যদি আপনার আর কিছুদিন চলে তাহলে তখনই বুঝতে পারবেন আপনার মাস্ত আপনাকে কোন দিকে ঠেলে দিয়েছে। এটাকে আপনি মাদক নেশার সাথে তুলনা করতে পারেন। যেমন “ইয়াবা”, আজ খেলেন তো মনে হলো আপনি পৃথিবীর রাজা। কিন্তু ২ বছর যেতে না যেতেই আপনি বুঝতে পারবেন আপনি কিভাবে ফুটপাতের প্রজা হয়ে গিয়েছেন। শর্টকাট আপনার ক্রিয়েটিভিটিকে নষ্ট করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট, সেই সাথে নিজের মধ্যে হতাশার বীজও বপন করতে আপনাকে সহায়তা করবে। আর কথা বাড়াচ্ছি না। নিচে কিছু উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরলাম “শর্টকার্ট” এর ভয়াবহতা নিয়ে।

 

১. আপনার ক্রিয়েটিভিটি চলে আসবে শূন্যের কোঠায়

প্রতিটি মানুষেরই কিন্তু একটা নিজস্বতা আছে। আর যার কারণে পুরো পৃথিবীর একটা ভারসম্যের উপর টিকে আছে। সবার হাতের ছাপ যেমন আলাদা, ঠিক চিন্তাভাবনার কোন না কোন অংশে আপনি পৃথিবীর সবার চেয়ে আলদা। আর এটা আরো ধারালো হয় নিজের মস্তিককে ঝালিয়ে। যাকে আমারা ক্রিয়েটিভিটি বলতে পারি। কিন্তু যখন আপনি অন্য একজনের পথকে নিজের পথ বানানো শুরু করবেন তখন আপনার নিজের মস্তিককে আর কাজে লাগাতে চাইবেন না। ধীরে ধীরে আপনি অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন। আর যখন সবাই আপনাকে ছেড়ে চলে যাবে ঠিক তখনই হতাশ হয়ে পড়বেন।

 

২. এটা আপনাকে পরনির্ভরশীল হতে শেখাবে

আরো একটা মারাত্মক বিষয় হচ্ছে “শর্টকাট” আপনাকে সম্পূর্ণরুপে পরনির্ভরশীল হতে শেখাবে। নিজের কর্মক্ষমতা দ্রুতই লোপ পেতে থাকবে। মন চাইবে না নিজে কিছু চিন্তা করি। সম্পূর্ণ সময়টি চলে যাবে অন্যদের টিউটোরিয়াল, মেথড অনুযায়ী কাজ গোছাতেই। ফলাফলঃ যখন আপনার কাছে আর কারো টিউটোরিয়াল কাজে আসবে না তখন বুঝতে পারবেন এতোদিন যা করেছেন তা নেহাতই সাময়িক। আর নিশ্চয় বুঝতে পারছেন যে তখন আপনি এক মহা সাগরের মধ্যে হাবুডুবু খাবেন।

 

৩. শর্টকাট আপনাকে অতি আত্ম-বিশ্বাসী বানিয়ে দেবে

আত্মবিশ্বাস অবশ্যই ভালো। তবে অতি আত্ম-বিশ্বাস কিন্তু বিপদের বড় করণ। যখন আপনি কোন “শর্টকাট” পেয়ে কাজ শুরু করবেন, তখন দেখবেন সব কিছু একদম অক্ষরে অক্ষরে হয়ে যাচ্ছে। চেয়েছিলেন ১০০.১৫৭ ডলার আয় করতে, ঠিক সেই অংকই আপনি আয় করেছেন। এভাবে কিছুদিন চলার পর আপনার কাছে প্রতিটি বিষয়েই মনে হবে আমি ঠিক যা করতে চাচ্ছি ঠিক তাই হবে। এটা এমন এক পর্যায়ে আপনাকে নিয়ে যাবে যা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। হুট করে যেদিন আপনি লস করে বসবেন তখন  আপনি নিজেই নিজেকে বুঝ দিতে পারবেন না। কারণ আপনার মস্তিক ততদিনে এতোই অতি আত্ম-বিশ্বাসী হয়ে পড়েছে যে তখন নিজেকেই নিজের কাছে তুচ্ছ মনে হবে। আর যা জন্ম দেবে একজন হীন মানুষিকতার ব্যক্তিকে ।

 

৪. সকল শর্টকাটকেই আসল “শর্টকাট” হিসাবে বিশ্বাস করা

সব পদ্ধতিই কাজ করে না। এটা চিরন্তন বাস্তব কথা। কিন্তু কেউ যদি আপনাকে ১০০% প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে যে এখান থেকে আপনি সফল হবেনই তাহলে এটা ধরে নিতে পারেন ওই প্রতিশ্রুতি আংশিক বা সম্পূর্ণ মিথ্যা। যখন আপনি “শর্টকাট” নির্ভরশীল ব্যক্তি হয়ে পড়বেন, আপনার হাতে প্রতিটি শর্টকাটকে প্রয়োগকরা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না। ফলে দেখা যাবে আপনার ১০ শর্টকাট এর মধ্যে ১টি সফল হয়েছেন আর বাকি ৯টির জন্য সময় দিয়েছেন ১ বছর ! ফলাফলঃ নিরেট সময় নষ্টকারী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে বেশি সময় লাগবে না।

 

৫. শর্টকাট আপনাকে শেখাবে প্রায় সব কাজ অন্যকে দিয়ে কারানো

অল্প কাজে বেশি আয়, এটা যখন আপনার মাথায় বদ্ধমূল হয়ে পড়বে তখন আর মন চাইবেনা নিজের কাজ নিজে করতে। কারণ আপনি ইতিমধ্যে আয় শুরু করেছেন, তাই দ্রুতই চিন্তা করবেন কি করে কিছু টাকা খাটিয়ে অন্যদের দিয়ে কাজটি করিয়ে নেয়া যায় এবং নিজে পা এর উপর পা তুলে আরামসে দিন পার করা যায়। আমি বলছিনা এগুলো খারাপ। একটা সময় সকল উদ্যোগতার  এই ধরনের মানুসিকতা কাজ করে। তাঁরা নিজে নিজে ৫ বছর খেটে এমন একটা পথ তৈরি করতে পারে। কিন্তু যাদি আপনি ৫ মাসেই এসে এমন করতে চান তাহলে অবশ্যই বুঝতে পারবেন আপনার জন্য সামনে কি অপেক্ষা করছে।

 

৬. নিজের লক্ষ্যকে নিজ হাতে হত্যা করা

ছোটবেলা থেকে আপনি ইচ্ছাপেষণ করে এসেছেন বড় হয়ে আপনি ডাক্তার হবেন, অথবা ইঞ্জিনিয়ার হবে। এক একজনের স্বপ্ন এক এক রকম। হয়তো নিজের জীবনের  ১০-১২ বছর শুধু পড়াশোনা করেই কাটিয়েছেন সেই “লক্ষ্যে” পৌঁছানর জন্য। কিন্তু হঠাৎ আপনার সামনে এমন এক লোভনীয় অফার চলে এলো যা আপনাকে অনেক বড় করতে পারবে। আর সেটা খুব অল্প কাজে অল্প সময়ে। ব্যাস লেগে গেলেন সেই “শর্টকাট’ এর পিছনে। ৫ মাস পর আবার অন্য একটা বিষয়ের উপর লক্ষ ঘুরিয়ে নিলেন। ৩-৪ বছর পর দেখা গেলো আপনি সেই কৈশোরে জন্ম নেয়া “লক্ষ্যের” মধ্যে নেই। ফলাফলঃ একূল ও হারালেন ওকূল ও হারালেন।

 

আরো অনেক বিষয় রয়েছে যা লিখতে পারলাম না সময়ের অভাবে। এগুলই মনে হয়েছে প্রধান পয়েন্ট, তাই এই ৬টি পয়েন্ট তুলে ধরলাম।

 

নতুনদের জন্য আমার অনুরোধ, শর্টকাট এ পা বাড়ানো থেকে যথা সম্ভব বিরত থাকুন। সেটা হতে পারে যেকোন বিষয়ে, সেটা হতে পারে ওয়েব ডিজাইন, গ্রাফিক ডিজাইন, এসইও, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং, ভিডিও মার্কেটিং অথবা ডাটা এন্ট্রি। এটি আপনার জীবনে বয়ে আনতে পারে একরাশ হতাশা এবং আপনাকে সে একজন অক্ষম মানুষ হিসাবেও প্রতিষ্ঠিত করে দিতে পারে।

 

তাই নিজের মনের কথা শুনুন। অন্যের দেখানো পথগুলো থেকে অনুপ্রেরণা নিন। কিন্তু সেখানেই পড়ে থাকবেন না। ঐ পথ থেকে নিজে আরো পথ বের করা শিখুন। এমন কিছু করুন যা পৃথিবীতে শুধু আপনিই জানেন এবং প্রয়োগ করতে পারেন। তাহলে আমি এতটুকু বলে পারি যে আপনার কখনো হতাশার মুখ দেখতে হবে না।



Leave Your Comments